উড়োচিঠি

উড়োচিঠি ১৮

অনু,
আল-পাশা থেকে লিখছি। এই চিঠি কোনোদিন তোমার কাছে পৌঁছাবে কিনা আমি জানিনা, একটা পোস্টবক্স দেখতে পেলাম, হয়ত তার পিছনের ধ্বংসাবশেষ কোনো একসময় পোস্টঅফিস ছিল, তাই এখানেই ছেড়ে যাচ্ছি চিঠি, যদি কোনো দিন পৌঁছায় সেই আশায়। এখানের সব টাওয়ার নষ্ট হয়ে গেছে, গোটা শহর বুঝে উঠতে পারছে না মাথার ওপর ছাদ নিরাপত্তা নাকি বিপদ। আমি মানুষ নেই আর, শুধু এটুকু জেনো, রক্ত দেখে আর হাত কাঁপে না, শুধু নিজের প্রাণের পরোয়া করি। সাজিদ আর আমি আজকের মত একটা আধ ভাঙা বাড়িতে রাত কাটাচ্ছি। মাঝে মাঝে কোথাও সময় মেপে ফায়ারিং চলছে। আর গোটা পৃথিবীতে শুধু আমার সামনে দপদপ করে মোমের আলো জ্বলছে।

আজ সকালে সাজিদ এখানকার একটা বাড়িতে নিয়ে গেছিল স্টোরি করার জন্য। বাড়ির লম্বা করিডোরে টিমটিম করে একটা রডলাইট জ্বলছে, সেই ফাঁকা বাড়িতে একজন মানুষও থাকে বলে আমার সন্দেহ হয়েছিল। মুহূর্তে মনে হল সাজিদ কোনো ভাবে যদি আমাকে কারো হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভেবে থাকে তাহলে তো আর কেউ কোনোদিন খোঁজও পাবে না। শুধু তোমাদের মুখটা মনে পড়ছিল অনু। করিডোরের সারি সারি দরজার একটা খুলতেই দেখলাম গোটা ঘর অন্ধকার। আমি বুঝে গেলাম আজ পাচারচক্রের হাতে শেষ দিন। কিন্তু চোখ সয়ে এলে বুঝলাম ঘরে কয়েকটা চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, না আর কিছুই না, শুধু তাকিয়ে আছে। ঘরের অন্ধকারের থেকেও সেই চোখে অনেক বেশী অন্ধকার, আমি শুধু বুঝলাম না, কেন সাজিদ আমাকে এখানে নিয়ে এল? এই সদ্যোজাত বাচ্চারা কিছু বলার ক্ষমতাও রাখে না, তাহলে কেন? কিন্তু তার পরের ঘরেও কয়েকটা বাচ্চা পাশাপাশি শুয়ে। আমি সত্যিই কিছু বুঝছিলাম না। এর পরে গোটা বাড়ির টোটাল ঊনিশটা ঘর আমি ঘুরে দেখেছি, সব মিলিয়ে সদ্যোজাত থেকে পাঁচ বছরের প্রায় চল্লিশ জন বাচ্চা, কিন্তু গোটা বাড়িতে কোনো কান্নার শব্দ নেই অনু। এক অসহ্য শান্তি এখানে, নার্সেরা চুপচাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কোনো অতিরিক্ত আওয়াজ নেই। বুঝলাম এরা কাঁদত প্রথমে, কেঁদে কেঁদে গলা চিরে ফেলেছে, কখনো বুলেট গাঁথা মায়ের স্তনে মুখ দিয়ে, কখোনো রাস্তার মাঝে, কখনো ধূলোয় খিদেয়, কংক্রিটের ছাদ চাপা পড়ে, কেউ কোলে তুলে।নেয়নি, তার পরে এরাও একদিন বুঝেছে কান্নায় কেউ সাড়া দেয়না এদেশে, কোনোদিন দেবে না, তাই এরা কান্না বন্ধ করে দিয়েছে, চিরকালের জন্য। আজ যখন ঘরে গিয়ে বসেছিলাম ওদের মধ্যে কেউ এক মুহূর্তের জন্যও এগিয়ে আসেনি। আমার কাছে কিছুই ছিল না, কাগজ ছিল, শুধু নৌকাই বানাতে পারি, ছোট্ট সাদমা কে একটা নৌকা দিয়েছি, আমি বুঝিনি অনু ও খুশী কি না, শুধু নৌকাটা অদ্ভুত চোখে দেখে শক্ত মুঠি করে রেখেছে এক হাত দিয়ে, ওর আর একটা হাত নেই।

বোমের স্প্লিন্টারে আর ধূলোয় অনেক দিন এখানে সূর্য ঢাকা পড়েছে অনু, ওদের চোখে আলো নেই। ওরা শুধু দেখছে, ফ্যালফ্যাল করে দেখছে। সাজিদ বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে এসেছে, ওরা খাচ্ছে, আমার সামনে, কুকুরের মত করে খাচ্ছে, নাকের জল আর মিষ্টি বিস্কুটের মণ্ড নেমে যাচ্ছে ওদের গর্তের মধ্যে, পেট ভরলে তবে ওরা কাঁদবে বোধহয়।

ইতি
আশিস দত্ত
সিনিয়র জার্নালিস্ট
BBC News
সিরিয়া।

©সৌম্য নন্দী

©photograph http://www.google.com

Advertisements
Standard
Uncategorized

#রোজকার_গল্প

দৌড়, দৌড়, দৌড়…
গোবরডাঙা লোকালটা আর একটু হলেই মিস হয়েছিল আর কি। লেডিস পেরিয়ে ভেন্ডার, ভেন্ডার পেরিয়ে প্রথম দরজাটা কোনোরকমে ধরে একধাক্কায় শরীরটাকে ভাসিয়ে ডানদিক নিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম।
ট্রেণ চলল। দমদমের মুখে বাঁক নিতেই ট্রেণের ধাতব চাকার সুরের সাথে আর এক সুর মিলল। পাশের চশমা পরা কাকুর মুখের ভাঁজে একরাশ বিরক্তি।কারণটা একটু পরেই স্পষ্ট। চাকার ধাতব সুর ছাড়িয়ে বগির গায়ের সুর ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তালের সাথে সাথে বগির দুলুনি ক্লান্তিটাকে শরীর থেকে নিংড়ে নিচ্ছে।  পাশ থেকে”কে তুমি নন্দিনী, আগে তো দেখিনি” ভারি গলা ছুটল। তালে তালে হাততালির খপ খপ আর বগির গায়ে প্রাণবন্ত যান্ত্রিক সুর। “গুলাবি আঁখে যো তেরি দেখি..” রফি, কিশোর, মান্না থেকে শানু আসরে কে না গাইল। চোখ বুজে মাথা নড়ছে পায়ে তাল, মান্না কিশোর নিয়ে ঝগড়া, তাসপেটার শব্দ আর হকারের হরেক চিৎকার নিয়ে হাওয়া চিরে এগিয়ে চলেছে আপ গোবরডাঙা লোকাল। ছড়িয়ে পড়ছে কলকাতা।
-দাদা সামনে বারাসাত?
-সবাই নামবে। লাইনে আসুন।
চলল গোবরডাঙা লোকাল। আমার কলকাতা নিয়ে। আমার শহর, আমার আলসেমি, আমার বিনোদন, আমার ঝগড়াকে সাক্ষী করে
“আপকি নজরো নে সামঝা…”-চলল…

Standard